একটি মুহূর্ত বদলে দিতে পারে একটি দেশের ফুটবল ইতিহাস। সেই রোমাঞ্চ নিয়েই মুখোমুখি হচ্ছে স্বাগতিক কানাডা ও আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো। একদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠা কানাডার স্বপ্নযাত্রা, অন্যদিকে ২০২২ বিশ্বকাপে আফ্রিকার ইতিহাস বদলে দেওয়া মরক্কোর অভিযান।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে মরক্কো অনেক বেশি অভিজ্ঞ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে নতুন ইতিহাস লিখেছিল তারা। সেই দলের অনেক তারকাই এখনো আছেন। অন্যদিকে কানাডা ১৯৮৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেললেও কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি। ২০২২ সালেও বিদায় নিতে হয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকেই। চলতি বিশ্বকাপ তাদের ফুটবলের নতুন জন্মের গল্প। প্রথমবারের মতো নকআউট জিতে শেষ ষোলোয় উঠে তারা গোটা দেশের ফুটবল মানচিত্র বদলে দিয়েছে।
কানাডা গ্রুপ পর্বে কঠিন লড়াই পেরিয়ে নকআউটে ওঠে। এরপর শেষ বত্রিশে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম নকআউট জয় তুলে নেয়।
মরক্কো প্রমাণ করেছে তারা বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের মতো পরাশক্তির সঙ্গে ড্র করে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেয়। নেদারল্যান্ডসকে ১–১ সমতার পর টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে।
কানাডার সবচেয়ে বড় ভরসা জোনাথন ডেভিড। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিসও ফিরেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমেই ম্যাচে গতি এনে দিয়েছিলেন তিনি। মাঝমাঠে স্টিফেন ইউস্তাকিও দলের ছন্দ ধরে রাখছেন, আর তরুণ লুক ডি ফুগেরোলেস রক্ষণে দারুণ পরিণত ফুটবল খেলছেন।
মরক্কোর শক্তির কেন্দ্র তাদের ভারসাম্যপূর্ণ দল। ডান প্রান্তে আশরাফ হাকিমির আক্রমণাত্মক দৌড় প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। ইসমাইল সাইবারি ধারাবাহিকভাবে গোল করছেন। গোলবারের নিচে ইয়াসিন বোনু আবারও নির্ভরতার প্রতীক। মাঝমাঠে বিলাল এল খান্নুস ও সতীর্থরা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে জানেন।
ম্যাচের আগে কানাডা কোচ জেসি মার্শ মরক্কোর প্রশংসা করে বলেছেন, মরক্কোর বিপক্ষে প্রস্তুতি নেওয়া যেন ‘ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন’। তবে তিনি এটাও জানিয়েছেন, সবাই তাদের আন্ডারডগ ভাবলেও সেটিই কানাডার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। অন্যদিকে তিনি বিশ্বাস করেন, তার দল নিজেদের ফুটবলের ধরণ বদলাবে না।
মরক্কো শিবিরেও আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই। ২০২২ সালের সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এবারও তারা শিরোপার অন্যতম অঘোষিত দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কানাডার বিপক্ষে তাদের লক্ষ্য আরেক ধাপ এগিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া।
দুই দলের হেড-টু-হেড পরিসংখ্যানেও এগিয়ে মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মরক্কো ২–১ গোলে হারিয়েছিল কানাডাকে। ২০১৬ সালের প্রীতি ম্যাচে মরক্কো ৪–০ গোলে জয় পায় এবং ১৯৯৪ সালের ম্যাচটি ১–১ গোলে ড্র হয়েছিল। এখন পর্যন্ত তিন দেখায় মরক্কোর দুটি জয়, একটি ড্র।
কৌশলগতভাবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে কানাডার গতি বনাম মরক্কোর বলের নিয়ন্ত্রণ। কানাডা দ্রুত পাল্টা আক্রমণে সুযোগ খুঁজবে, বিশেষ করে ডেভিড ও ডেভিসকে কাজে লাগিয়ে। অন্যদিকে মরক্কো হাকিমির ওভারল্যাপ, সাইবারির ফিনিশিং এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ম্যাচ নিজেদের হাতে রাখতে চাইবে।
কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের জন্য এটি কানাডার নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ, আর মরক্কোর প্রমাণ করা ২০২২-এর সেমিফাইনাল ছিল না কোনো বিস্ময়। স্বাগতিকদের স্বপ্ন কি আরও বড় হবে, নাকি আটলাস লায়ন্স আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গর্জন শোনাবে?


